পশ্চিমা বিশ্ব উদ্বিগ্ন হুয়াওয়েকে নিয়ে।

34

কালের সমাচার ডেস্ক।

গুগল ঘোষণা করেছে গুগল অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের কিছু আপডেট বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন কোম্পানি হুয়াওয়েকে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।

এর মানে অনেক অ্যাপ আর ব্যবহার করা যাবে না হুয়াওয়ের নতুন স্মার্টফোনগুলোতে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন ‘বিদেশি শত্রুদের’ কাছ থেকে তার দেশের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক রক্ষায়।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, আসলে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে এই পদক্ষেপের আসল টার্গেট ছিল।

হুয়াওয়ে তার স্মার্টফোনের কারণে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কিন্তু আরও বহু রকম কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট তৈরি করে তারা।

হুয়াওয়ে তাদের যন্ত্রপাতি যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি না করতে পারলেও, হুয়াওয়ে বিশ্বজুড়ে কমিউউনিকেশন নেটওয়ার্কের ৪০ হতে ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করবে।

যে কারণে বিভিন্ন দেশ হুয়াওয়েকে নিয়ে এতটা চিন্তিত?

এর পেছনে খুবই জটিল কিছু অভিযোগ আছে। এর মধ্যে আছে গুপ্তচরবৃত্তি থেকে শুরু করে চুরি যাওয়া রোবট,

হীরের প্রলেপ দেয়া গ্লাসস্ক্রিন থেকে ইরানের সঙ্গে গোপন চুক্তি- অনেক কিছুই।

ফাইভ-জি: সুপারফার্স্ট কিন্তু নিরাপদ কি?
মোবাইল টেলিফোনের ক্ষেত্রে পরবর্তী বিপ্লব হিসেবে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ককে ধরা হয়।

এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক বসানোর জন্য হুয়াওয়ে অনেক দেশের সঙ্গেই আলোচনা চালাচ্ছে।

এত দ্রুতগতির হবে এই নতুন নেটওয়ার্ক যে এটি বহু নতুন কাজে ব্যবহার করা হবে। যেমন চালকবিহীন গাড়ি চালানো।

হুয়াওয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো দাবি করছে এখন যদি হুয়াওয়ে কোন দেশের ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে,

ঐ দেশের ওপর চীন গুপ্তচরবৃত্তি চালাতে পারবে। এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্কে আদান-প্রদান করা বার্তা তারা চাইলে পড়তে পারবে,

চাইলে বন্ধ করে দিতে পারবে নেটওয়ার্ক বা সেখানে তৈরি করতে পারবে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা।

অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের আগেই পশ্চিমা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে হুয়াওয়ের সঙ্গে ব্যবসা না করার জন্য একটা চাপ সৃষ্টি করেছিল।

এই দেশগুলো ‘ফাইভ আই’স’ বলে পরিচিত একটি গ্রুপ। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া গ্রুপের বাকী চারটি দেশ যুক্তরাজ্য, কানাডা,অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড।

গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য এই পাঁচটি দেশের মধ্যে খুবই ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আছে। এর বেশিরভাগটাই ইলেকট্রনিক উপায়ে করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এই পাঁচ দেশের কোন দেশ হুয়াওয়ের নেটওয়ার্ক যদি তাদের গুরুত্বপূর্ণ কোন ইনফরমেশন সিস্টেমে বসায়,

তাহলে তারা আর কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সেই দেশের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবেন না।

অবশ্য হুয়াওয়ে বারবার জোর দিয়ে বলেছে, তারা চীন সরকারের হয়ে কখনোই গুপ্তচরবৃত্তি করবে না।

কিন্তু সমালোচকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন একটি চীনা আইনের প্রতি যার কারণে অসম্ভব হবে কোন কোম্পানির পক্ষে গোয়েন্দা তথ্য চেয়ে চীনা সরকারের অনুরোধ উপেক্ষা করা।

আরও বলছে হুয়াওয়ে, তাদের যদি যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হয় সেটি ক্ষুন্ন করবে মার্কিন ভোক্তাদের স্বার্থ।

কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এর ফলে হুয়াওয়ের বিকল্প হিসেবে অনুন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ফাইভ-জি প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়বে।

এধরনের ‘প্রযুক্তি গুপ্তচরবৃত্তির’ ভয় করছে যুক্তরাষ্ট্র যে, তার কারণ হয়তো তারা নিজেরাই বছরের পর বছর এরকম কাজ করেছে।

এনএসএ’র সাবেক কন্ট্রাক্টর এডওয়ার্ড স্নোডেন তার ফাঁস করা তথ্যে দেখিয়েছেন মার্কিন নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কীভাবে বড় বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির নেটওয়ার্ক হ্যাক করে তথ্য চুরি করতো।

এর মধ্যে আছে গুগল এবং ইয়াহুর মতো কোম্পানি।

কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি দেশের কোম্পানিকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।

রোবট এবং অস্ত্র কেলেংকারি
জিনিসটা অতিদ্রুত গতির ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো কঠিন।

কিন্তু অতটা কঠিন নয় হুয়াওয়েকে ঘিরে অন্য কেলেংকারিটি বোঝা।

একটি রোবটের হাত চুরির অভিযোগ আনা হয় তাদের এক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

তবে প্রকৌশলী অভিযোগ করছেন, এটি চুরি ছিল না, ব্যাপারটি ঘটেছে দুর্ঘটনাবশত।

টি-মোবাইলের ডিজাইন ল্যাবে গিয়েছিলেন তিনি। একটি রোবটের হাত ব্যবহার করে সেখানে স্মার্টফোনের স্ক্রীন পরীক্ষা করা হয়।

দুর্ঘটনাবশত যন্ত্রটি তার ব্যাগের মধ্যে পড়ে যায়। ল্যাব থেকে বেরিয়ে আসার সময়, তখন বিষয়টি খেয়াল করেননি।

তখন হুয়াওয়ের পার্টনারশীপ ছিল জার্মান কোম্পানি টি-মোবাইলের সঙ্গে।

এই কথা টি-মোবাইল বিশ্বাস করেনি। এরপর ভেঙ্গে যায় দুই কোম্পানির মধ্যে সম্পর্ক।

নতুন কিছু ইমেল ফাঁস হওয়ার পর আবার কথাবার্তা শুরু হয়েছে এই কেলেংকারি নিয়ে।

এসব ইমেলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে হয়তো চীনে তার উর্ধ্বতন কোন কর্মকর্তার নির্দেশে প্রকৌশলী এই কাজ করেছিলেন।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে কানাডায় হুয়াওয়ের চীফ ফিনান্সিয়াল অফিসার মেং ওয়ানজুকে গ্রেফতার করা হয়, তার একটি কারণ এটি।

ইরানের সঙ্গে গোপন আঁতাত?
কানাডা থেকে মিজ মেং ওয়ানজু তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়ার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন।

তিনি অস্বীকার করেছেন গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ। তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন ইরানের সঙ্গে কোন গোপন আঁতাতের কথা।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কীভাবে ফাঁকি দেয়া যায়,

তিনিও সেরকম এক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন স্কাইকম নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে।

অভিযোগ আছে তিনি ব্যাংকগুলোকে ইরানের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক লেন-দেনের অনেক কিছুর ব্যাপারে এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যে কথা বলেছেন।

হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতার কন্যা মিজ মেং। তাকে বিচারের জন্য যদি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয় এবং তিনি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে সাজা হতে পারে তিরিশ বছর পর্যন্ত।

স্মার্টফোনের ভাঙ্গা স্ক্রীন এবং অঙ্গীকার বরখেলাপ
ব্লুমবার্গের দেয়া তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ তদন্ত করছে।

এর একটি, তারা পরীক্ষা করে দেখার নামে ধার নেয়া একটি স্মার্টফোনের স্ক্রিনের নমুনা পাচার করে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে।

খুব সহজেই ভেঙ্গে যায় মোবাইল ফোনের স্ক্রিন। কাজেই যদি এমন একটি স্ক্রিন তৈরি করা যায়, যেটি কোনভাবেই ভাঙ্গবে না,

সেটি একটি বিরাট আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে যে কোন প্রযুক্তি কোম্পানির জন্যই।

যুক্তরাষ্ট্রে আখান সেমিকন্ডাক্টার নামের একটি কোম্পানি হুয়াওয়েকে প্রস্তাব দেয় এরকম একটি কাঁচ তৈরি করে দেয়ার।

তাদের মধ্যে এটি নিয়ে আলোচনা চলছিল। হীরের প্রলেপ তারা দেয়া হুয়াওয়েকে যে কাঁচের স্ক্রিনটি দেয়,

যখন কয়েক মাস পর সেটি ফেরত আসলে, দেখা যায় সেটি ভাঙ্গা। ব্লুমবার্গের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

এটি তদন্ত করছে এফবিআই। এভাবে এটি দেশের বাইরে নেয়া যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অবৈধ ছিল।

হীরের প্রলেপ দেয়া কোন জিনিস এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নেয়া যায় না, কারণ এ ধরনের জিনিস লেজার অস্ত্রে ব্যবহার করা যায়।

এই অভিযোগও অস্বীকার করছে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.